সাফায়েত, তোমার এই বইয়ের নাম লাবিবের বিভ্রম। লাবিবটা কে? তোমার মামাতো ভাই?
লাবিব আমার একমাত্র মামাতো ভাই।
আমাদের
এইখানে আব্বা-আম্মার নাম দিয়ে স্কুল কলেজ করার প্রবণতা আছে অবশ্য। তারপরেও ভাইকে নিয়ে
বই করলা কেন?
কারণ আমার আপন কোন ভাই নেই, তাই মামাতো ভাইরে
আপন ভাইয়ের জায়গায় স্থান দিয়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলছি। তীব্র শোকের জায়গা থেকে আমার প্রথম
বই লাবিবকে উৎসর্গ করেছি। আমি সচেতন ভাবে এই কাজটি করে আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে
বলেছি; সবাই তাদের প্রথম বই মা-বাবাকে উৎসর্গ করে কিন্তু আমি তা করিনি, সে জন্য তোমরা
মন খারাপ করিও না। আমার এই বইয়ের মধ্যে দিয়ে আমার ভাই লাবিব আজীবন বেঁচে থাকবে।
বইয়ের
মধ্য দিয়ে কেউ বেঁচে থাকতে পারে, এই ধারণাটা তৈরি হওয়ার কারণ কি?
আমরা কেউ থাকবো না, কিন্তু আমাদের কর্ম টিকে
থাকবে। আমরা সবাই কাজ করি, কিন্তু কিছু কাজ আছে যা যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে থেকে যায়।
শিল্প সাহিত্য তেমনই টিকে থাকার মত কাজ। প্রতিদিনই প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, সবাই
লেখা লেখি করে এক ধরনের আত্মসন্তুষ্টির জায়গা থেকে, কিন্তু আমি লাবিবের বিভ্রম যতটা
নিজের জন্য লিখেছি ঠিক তারচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছি আমার আশেপাশে থাকা আত্মীয় স্বজনের প্রতি, কারণ তাদের চিন্তার সুস্থ বিকাশে আমি এক
ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করি, তাই বই প্রকাশ করে সেই কাজটি কিছুটা হলেও নিরসন করলাম।
তুমি
এমন একটা সময় বইটা করেছ, যখন করোনা ক্রাইসিস চলছে। প্রিন্টের দুর্দিন চলছে। লোকজন পত্রিকা
নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। বইয়ের দোকানগুলা অনলাইনে সেল করার ট্রাই করছে। তোমার কি একবারও
মনে হয় নাই বইমেলায় বইটা আসুক?
বই মেলা আসার আগে আমার আরো কিছু বই প্রকাশের
ইচ্ছে আছে, তাই লাবিবের বিভ্রম মূলত বই মেলার জন্য অপেক্ষা করেনি। আমার পরের মাসে একটি
উপন্যাস প্রকাশিত হবে আশা করছি। মেলায় একসাথে অনেকগুলো বই নিয়ে হাজির হবো ইনশাআল্লাহ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি; করোনার মত এমন
দুর্যোগের সময়ে মানুষের বই পড়া বেড়ে গেছে, অবসর সময়ে বিনোদনের জন্য মানু্ষ নানান দিকে
ঝুঁকে পড়ছে। আমি পাঠকদের নিয়ে ভীষন আশাবাদী বলেই এমন দুর্দিনে তাদের জন্য ভালো কিছু
তুলে দিতে চেয়েছি।
তোমার
বই নিয়ে বলো। কতগুলা গল্প? কী কী?
‘লাবিবের বিভ্রম’ ১৩টি ছোটগল্প নিয়ে আমার
প্রথম প্রকাশিত বই। প্রতিটি গল্পের পরিবেশনা ভীষণ উপভোগ্য। পাঠক প্রতিটি গল্পে অনায়েসে
ডুবে যাবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রতিটি চরিত্রে ঢুকে পড়বে। বারবার পড়তে গিয়ে খুঁজে পাবে
অন্তিম আমেজ। বাহুল্যতা এড়িয়ে চর্বিত চর্বণ না করে চেস্টা করেছি প্রতিটি গল্প উপস্থাপন
করার, বাকিটা পাঠকের হাতে ছেড়ে দিতে চাই।
প্রতিটি
গল্পের পরিবেশনা ভীষণ উপভোগ্য। পাঠক প্রতিটি গল্পে অনায়েসে ডুবে যাবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে
প্রতিটি চরিত্রে ঢুকে পড়বে। বারবার পড়তে গিয়ে খুঁজে পাবে অন্তিম আমেজ। এইটা কি আশাবাদ?
আশাবাদ শব্দটি শুনলে মনে হয় অন্ধকারে ঢিল
ছুঁড়ে দিচ্ছি। তারচেয়ে বরং আমি বলবো; ‘লাবিবের বিভ্রম’ বইটি আমার কাজের আত্মবিশ্বাস।
আমি প্রচন্ড দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি; লাবিবের বিভ্রম বইটি শেষ করে যে কেউ নড়েচড়ে
বসবে। মনস্তাত্বিকভাবে বড়সড় ধাক্কা খেতে পারেন, তাই এক ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে
বইটি পড়া উচিৎ।
পূর্ব
প্রস্তুতি বলতে? একজন পাঠকের কি কি পড়ে আসা উচিত? তুমি নিজে জার্নালিজমের ছাত্র। এর
মানে তো এই নয় যে, গল্প বই পড়তে জার্নালিজম ধরে আসতে হবে।
পূর্বপ্রস্তুতি বলতে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান বুঝিয়েছি, বেকগ্রাউন্ড বুঝাইনি। লাবিবের বিভ্রম পড়ার জন্য সাহিত্যবিশারদ হতে হবে না, সুধু বুঝাতে চেয়েছি মানসিক মনোবল দরকার, কারণ আমার বইয়ের অধিকাংশ গল্প ভীষন সাইকেডেলিক, অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্নে ঠাসা।
তুমি
অন্ধকার দেখ?
সেইটা লেখার সাথে কি সম্পর্ক? ছোট করে একটি
তথ্য দিয়ে রাখি; এখানে অন্ধকারাচ্ছন্ন বলতে বুঝিয়েছি আমাদের ব্যাখ্যাতীত জীবন, যেখানে
কখনই হিসাব মিলে না।
আমি
আসলে জানতে চাইছি, বাতি নিভাই অন্ধকার দেখ না নিভাই দেখ?
আমি দুই দিক থেকেই দেখতে পাই।
তাইলে
তো ভালোই। আমি আলাপ শেষ করব, তোমার বইয়ের জন্য শুভেচ্ছা তো আছেই। এটা তুমি জানো, তুমি
কি তোমার বইয়ের যে কোনো একটা গল্প নিয়ে বলবে? খুব ছোট করে জাস্ট একটা গল্প দিয়ে বইটা
ডিফাইন করবে?
বইয়ের কোন একটি গল্প দিয়ে পুরো বই ডিফাইন
করা মোটেও সম্ভব না, কারণ ১৩টি গল্পের প্রতিটি গল্প ভিন্ন, প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন। উপন্যাস
হলে হয়তো সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা যেত।
কিন্তু
তারপরেও তো একটা লেখা থাকে, যেটাতে বায়োগ্রাফি ঢুকে যায়। থাকে না? একটা লেখা নিজের
থাকে না? আন্সার দিতে হবে না, থাকুক এইটা।
প্রথম প্রচ্ছদ উল্টে গেলেই বইয়ের ইন্ট্রোডাকশন চোখে পড়ে, কিন্তু আমি সচেতনভাবে এই কাজটি এড়িয়ে গেছি।
লেখক তার নতুন বই প্রকাশকালের
অনুভূতি এবং সমসাময়িক সাহিত্য প্রসঙ্গে বিবিধ ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন নাজমুস সাকিব রহমান
এর সঙ্গে।
------------***-------------

0 মন্তব্যসমূহ