ইরফান খানের অসাধারণত্ব

মহাপ্রয়াণের দিকে ছুটে গেলেন ইরফান খান এবং ঋষি কাপুর। একদম না ফেরার দেশে চলে গেলেন। শেষ বয়সে ঋষি কাপুর অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন, নিজেকে ততোটা বিস্মৃত করেন নিখ্যাতির স্তর যেন শত্তুর-আশির দশকে আঁটকে গেছে। যদিও একই সময়ের বেড়ে উঠা অমিতাব বচ্চনকে যতটা টিপিক্যাল ইমেজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে, তার অনেক কিছুই ঋষি কাপুরকে সম্মুখীন হতে হয় নি। অপ্রাসঙ্গিক হলেও সত্য, একজন উঁচু দরের অভিনেতা হিসাবে ঋষি কাপুর অতুল্য, তিনি সূক্ষ্মতম অভিব্যক্তি দিয়ে আমাদের বহুবার বুঝিয়েছেন; ব্যক্তি চরিত্র ভেঙে কিভাবে ঢুকে যেতে হয় একেকটি অভিনব চরিত্রে, কিভাবে নিজস্ব ম্যানারিজম তৈরি করতে হয়। নানান সব চরিত্রে দেখিয়েছেন জগতে একচেটিয়া ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষ বলে কিছু নেই। একজন কথিত ভালো মানুষের মধ্যে খারাপ মানুষ লুকিয়ে থাকে, আবার উল্টোটাও ঘটে।

ইরফান খানের অসাধারণত্ব মূলত চোখের অভিব্যক্তি, যা এক কথায় অনবদ্য দর্শককে সহজে কাছে টেনে ধরেএই খান সাহেবকে নিয়ে সবার আগ্রহ বরাবরের মতোই অনেক বেশী। তিনি কেবল চোখ দিয়ে অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতি চিত্রায়িত করে অসংখ্য দর্শকের কাছে যেতে পেরেছেন। সকল ভক্তবৃন্দ ভীষণ দুঃখ আর শূন্যতা অনুভব করছে সাহেবজাদা ইরফান খানকে হারিয়ে।

বলিউডে তিনিই একমাত্র ইরফান খান। যার সাথে কারো কোন দ্বন্দ্ব কিংবা মনমালিন্য ছিলনা। যাকে বলা হতো স্বল্প ভাষী, বিনয়ী প্রকৃতির এবং একই সাথে ভার্সেটাইল জগতের একজন শক্তিমান অভিনেতা। মঞ্চ দিয়েই শুরু অভিনয় জগতে, তারপর ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতেনদীর্ঘকাল কেউ যেন নোটিশই করলো না। এক জীবনে নানাবিধ হোঁচট খেলেনযদিও বহু সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে বলিউডে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পেলেন। এতো বড় অবস্থান তৈরি করেছেন, এইযে ''অবস্থান'' যতোটা সহজ করে বলেছি, তার মধ্যে চিরায়ত আছে অসংখ্য ঘাম জড়ানো তিক্ততাহেরে যেতে যেতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মতো তিক্ত অবিজ্ঞতা। কোন এক মিডিয়া কনফারেন্সে ঋষি কাপুর কথার প্রসঙ্গে বলেছিলেন; 'হারনে বালিকু জিতনেকি সাধ মিলতিহে', মানে হেরে যাওয়ার মধ্যেই জয়ের আনন্দ। ইরফান খান ছিলেন বলিউডের সীমানা ছাড়িয়ে একজন আন্তর্জাতিক অভিনেতা। তিনি প্রথম অভিনীত পুরুষ যে বলিউড শব্দ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, বিবিসি এর সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন; ‘হলিউড যেখানে তার নিজস্ব কালচার কে অব্যাহত রেখে সারা বিশ্বের কাছে সিনেমা পৌঁছে দিতে চায়, সে দিক থেকে বলিউড তার বিপরীত মুখী, তারা যেন উল্টো পথে হাঁটছে, সব মশলা মাখানো রঙচটা সিনেমা, নতুন দর্শক নিয়ে কোন ভাবনা নেই। যেখানে বলিউডে রয়েছে বিস্তর সংকীর্ণতা তেমনি হলিউডে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততার ভীষণ স্বল্পতা’।

তিনি বাংলাদেশের পরিচালক মুস্তফা সারয়ার ফারুকির নির্মিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের বায়োপিক অবলম্বনে 'ডুব' ছবিতে অভিনয়ে করেছেন। এছাড়া হলিউডের নামকরা 'লাইফ অফ পাই', 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড', ইনফার্নোর মতো জনপ্রিয় সব মুভিতে কাজ করেছেন। ক্রিস্টোফার নোলানের পরিচালিত ‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিতে প্রথমে ইরফান খানকে মনোনীত করেন, একই সময়ে ''পিকু'' সিনেমায় কাজের ব্যস্ততায় শিডিউল দিতে পারেন নি। গতবছরের ব্যবসা সফল ‘অ্যাংরেজি মিডিয়াম’ ছবির মাধ্যমে ইতি টেনে দিলেন শেষ সিনেমার কাজ।

নিওরোএন্ডোক্রাইন টিউমার নামের বিরল ক্যানসারে সঙ্গে লড়াই নিয়ে আবেগঘন হয়ে ইরফান বলেছিলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল অন্যরকম। দ্রুতগতির একটি ট্রেনে ঘুরছিলাম। সেখানে স্বপ্ন, পরিকল্পনা, আকাঙ্ক্ষা এসবই ছিল। এসব কিছুকে ঘিরে আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ কেউ আমার কাঁধে হাত দিলো এবং আমি পিছু ফিরে তাকালাম। তিনি ছিলেন টিকিট কালেক্টর। আমাকে জানালেন, ‘আপনার গন্তব্য চলে এসেছে। অনুগ্রহ করে নামুন।’ আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললাম, ‘না, না। আমার গন্তব্য আসেনি।’ টিকিট কালেক্টর বললেন, ‘না, এটাই আপনার গন্তব্য। কখনও কখনও এমন হয়।’

লেখকঃ সাফায়েতুল ইসলাম

--------------***------------------

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ