এক টাকার আহারে ‘বিদ্যানন্দ’

এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা চরম পর্যায়ে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, শিক্ষা ও খাদ্য এই দুটি প্রধান মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম, প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কখনো উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে পারেনা। তাই এসব অধিকার বঞ্চিত শিশুকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ। তার সাথে খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা। এখনও বাংলাদেশে অনেক অঞ্চল আছে যেখানে শিশুরা বেড়ে উঠতে চায় বই পড়ার আনন্দ নিয়ে, কিন্তু সকলে কি সেই সুযোগ পাচ্ছে? তেমন কিছু শিশুদের জন্যই এক বেলার আহার আর শিক্ষা নিশ্চয়তা দানে প্রতিদিন নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান 'বিদ্যানন্দ', পড়বো খেলবো শিখব এই শ্লোগানে ২০১৩ সাল থেকে বিদ্যানন্দের পথ চলা, পথ চলতে চলতে হোঁচট খাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাধারণ কিশোর কুমার দাশ এই বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা, স্মৃতিশক্তির সাথে শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তিতে দুর্বল এই মানুষটি গত তিন বছর ধরে নিজের সঞ্চয়ের সকল অর্থ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন 'বিদ্যানন্দ।  ইতিমধ্যে অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছে।

এক ট্যাকার ভাত আইছে রে..বলে প্রতিদিনের নিয়ম করে ছুটে সুবিধা বঞ্চিত পথ শিশু, এক টাকায় পেট পুরে খাওয়ার কথা আপনি হয়তো চিন্তাও করেন না। কিন্তু এই অভাবনীয় বিষয়টিকেই সত্যি করেছে বিদ্যানন্দ। এক টাকায় আহারপ্যাকেজের ধারণা তৈরি হয়েছে এক করুণ বাস্তব লব্ধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। ঘটনাটা ছিল ঠিক এমন-আজ থেকে ২০ বছর আগের নগরীর কালুরঘাট  এলাকায় চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান উপলক্ষে মানুষজনের জন্য আয়োজন করা হয়েছে প্রচুর খাবার, তখন চৌদ্দ বছর বয়সী এক অভাবী শিশু অন্যদের মতো লাইনে দাঁড়িয়েছিল এক প্লেট খাবারের আশায়। কিন্তু সেখানে অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় ঠেলে এক প্লেট খাবার উদ্ধার করা যেন দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠল ! এত কিছুর পরও পাওয়া না পাওয়ার নানাবিধ জটিলতা থেকে সিদ্ধান্ত নেয় একদিন এমন কিছু করবে যাতে সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের খাবারের জন্য কোনো কষ্ট করতে না হয়। বর্তমানে সেই পুরনো ব্যর্থতার গ্লানি কে কর্মে রূপ দিয়ে প্রতি চার মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার সুবিধা বঞ্চিত শিশুকে খাবার দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘরোয়া পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত করা হয় এই খাবার। এক-ঝাঁক স্বেচ্ছাসেবক এসব খাবার বিতরণ করেন রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রাম সহ নানা প্রান্তে।    

মজার ব্যাপার হচ্ছে- প্রতি বেলা খাবারে শিশুদের থেকে খাদ্যের বিনিময়ে এক টাকা করে নেওয়া হয়
, টাকার মানটা যতই ক্ষুদ্র হোক ক্রেতারা যাতে গর্ব করে বলতে পারে ফ্রি তে খাবার নিইনি, টাকা দিয়ে কিনেছি খাবার।’’ এজন্যই খাবারের এ দাম বসিয়ে দেওয়া, যাতে ক্রেতাদের মধ্যে ভিক্ষাএবং দাতাদের মধ্যে দানশব্দটির অনুভূতি আর না থাকে।                                                                                                                                                        
এক টাকার আহার
 
মানবতার বিকাশ এবং জাতির বৃহত্তম স্বার্থে পথ শিশুদের শিক্ষা আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় ভাবে সুবিধা বঞ্চিত এই শিশুদের নিয়ে দৈনিক প্রচুর লেখা লেখি আর কথার ঝড় বয়ে চলে, কম বেশ সহানুভূতি কিংবা তীব্র নিন্দার ভাষা জানা আছে অনেকেরই। কিন্তু সত্যিকার ভাবে মানবতা দিয়ে পাশে দাঁড়ায় কয়জন ? যে অল্প কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান বিপদে পাশে থেকে মানুষকে সহযোগিতা যোগায় 'বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন' এমনই একটি নাম। দৈনিক সময়ের চোখ রাঙ্গিয়ে শতাধিক নিবেদিন প্রাণে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনে। অসংখ্য বাঁধা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চায় যেখানে মৌলিক জ্ঞান অর্জনে ধনী-গরীব কোন ভেদাভেদ থাকবে না। আর তা বাস্তবায়ন অর্জনের হিসেবটাই বেশী, যেমন- বিদ্যানন্দতে বর্তমানে তিন শতাধিকেরও বেশী নিয়মিত শিক্ষার্থী শিক্ষা পাচ্ছে, কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি সমাজ রাষ্ট্র রাজনীতি এবং সাহিত্যের যে কোন ধারায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞানে সমৃদ্ধ লাভ করতে পারে সেই প্রত্যাশায় প্রায় সাত হাজারেও বেশী বইয়ের সমন্বয়ে তিনটি পাঠাগার গড়ে উঠেছে, এছাড়াও রয়েছে মেধা বিকাশে টিচিং সেন্টার, গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ফ্রিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং, অসচ্ছল মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রধান এবং বিনা মূল্যে বই বিতরণ।

বিদ্যানন্দের দুইটি বড় ধরনের পদক্ষেপে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অর্জন ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখিত
, দশ হাজার শিশুর জন্য 'ফ্রেমে বাঁধা শৈশব' নামে একটি পদক্ষেপ ছিল, যেখানে এ দেশের অধিকাংশ গরীব পথ শিশুরা তাদের শৈশবের কোন ছবিই সংরক্ষণ করতে পারে না, আর তাই বিদ্যানন্দ এগিয়ে এসে দশ হাজার শিশুর ছবি তুলে তা অভিভাবকদের মাঝে তুলে দেয়। আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে 'চলো বন্ধু হই', এই পদক্ষেপে বিদ্যানন্দ বন্ধুত্ব তৈরি করে, সাধারণত তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করে যাদের পছন্দ হয়, তাকে নয় যা তাদের প্রয়োজন। যা বন্ধু সৃষ্টি করার কার্যক্রমে নিজেদের গণ্ডির বাইরে বন্ধু হতে উৎসাহিত করে। 

সবার জন্য শিক্ষার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।  বিদ্যানন্দ তার অদূর সাফল্য আর অসীম সম্ভাবনা নিয়ে একটু একটু করে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে
বর্তমানে সমাজের বিত্তবান থেকে ধরে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। পথশিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত" এ সমাজ দূরীকরণে একদিন এই বিদ্যানন্দ বাংলাদেশে অন্যতম ভূমিকা রাখবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।   

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ